মেঘ মালা চন্দ্র : জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানের এক্স (সাবেক টুইটার) অ্যাকাউন্ট থেকে কর্মজীবী নারীদের নিয়ে দেওয়া মন্তব্য ঘিরে রাজধানীসহ সারাদেশে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। নারীদের ঘরের বাইরে কাজ করাকে একধরনের পতিতাবৃত্তির সঙ্গে তুলনা করে করা ওই মন্তব্যের প্রতিবাদে নারী সমাজ, শিক্ষার্থী এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন রাজপথে নেমেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হওয়া ক্ষোভ দ্রুতই রূপ নেয় সরাসরি আন্দোলনে। এ ছাড়া চলতি সপ্তাহেই জামায়াতে ইসলামীর আমিরের বিরুদ্ধে আরও কঠোর কর্মসূচি ঘোষণার প্রস্তুতির কথাও জানিয়েছেন আন্দোলনকারীরা।
ঘটনার পর জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, আমিরের এক্স অ্যাকাউন্টটি “হ্যাক” হয়েছিল। তবে এই ব্যাখ্যাকে অনেকেই দায় এড়ানোর পুরোনো কৌশল হিসেবে দেখছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, একটি অ্যাকাউন্ট হ্যাক হওয়া আর নারীবিদ্বেষী মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ এক বিষয় নয়। বরং এই মন্তব্য জামায়াতে ইসলামীর আদর্শিক অবস্থানেরই প্রতিফলন।
রবিবার দুপুর ১২টার দিকে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের উদ্যোগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিন থেকে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের হয়। মিছিলটি ক্যাম্পাস প্রদক্ষিণ করে অপরাজেয় বাংলার সামনে গিয়ে শেষ হয়। বিক্ষোভে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীরা বলেন, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন মন্তব্যের প্রতিবাদ নয়; বরং জামায়াতের দীর্ঘদিনের নারীবিরোধী রাজনৈতিক দর্শনের বিরুদ্ধে সরাসরি অবস্থান।
মিছিলে ‘দেশের শক্তি অর্ধেক নারী’, ‘শফিক তুই ক্ষমা চা’সহ বিভিন্ন স্লোগান দেওয়া হয়। আন্দোলনকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, একজন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতা যখন কর্মজীবী নারীদের অবমাননাকর ভাষায় চিহ্নিত করেন, তখন সেটিকে ‘ভাষার ভুল’ বলে ব্যাখ্যা করা যায় না।
সমাপনী বক্তব্যে ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব বলেন, জামায়াত আমিরকে অবিলম্বে নারী সমাজের কাছে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইতে হবে। অন্যথায় আরও কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। তিনি বলেন, “এই দেশ আর জামায়াতের মধ্যযুগীয় চিন্তাকে নীরবে মেনে নেবে না।”

ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাসির উদ্দিন নাসির জামায়াতের ‘আইডি হ্যাক’ দাবিকে কটাক্ষ করে বলেন, “আইডি হ্যাক হয়নি, আসলে চিন্তাভাবনাটাই হ্যাক হয়ে আছে।” তার ভাষায়, নারীর স্বাধীনতা ও মর্যাদার প্রশ্নে জামায়াতের অবস্থান নতুন নয়; এটি তাদের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক চরিত্রেরই অংশ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি রাজধানীর মিরপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় নারী সমাজ ঝাড়ু মিছিল করে প্রতিবাদ জানায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রী ও সাধারণ মানুষ প্রকাশ্যে জামায়াত আমিরের ক্ষমা প্রার্থনার দাবি জানান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনার ঝড় ওঠে।
এদিকে কর্মজীবী নারীদের নিয়ে জামায়াত আমিরের মন্তব্যের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে প্রীতিলতা ব্রিগেড। সংগঠনটির সমন্বয়ক সাদিয়া ইমরোজ ইলা এক বিবৃতিতে বলেন, “বাংলাদেশের জনসংখ্যার অর্ধেক নারী। দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে নারীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। গার্মেন্টসসহ বিভিন্ন খাতে লক্ষ লক্ষ নারী কর্মরত। জামায়াত আমিরের মন্তব্য শুধু অপমানজনকই নয়, এটি ভবিষ্যতে কর্মজীবী নারীদের হেনস্তার পরিবেশ তৈরি করতে পারে।”
তিনি আরও বলেন, “এই মন্তব্য কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামীর মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ। কিছুদিন আগেই তাদের এক নেতা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করেছিলেন। এসব বক্তব্য তাদের দীর্ঘদিনের লালিত চেতনারই ফল।” তিনি অবিলম্বে জামায়াত আমিরের প্রকাশ্যে ক্ষমা প্রার্থনা এবং জামায়াতের এই রাজনীতি বয়কটের আহ্বান জানান।
বাম রাজনৈতিক দলের নেতারাও এই ঘটনায় প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন, জামায়াতে ইসলামীর “আসল রূপ” প্রকাশ পেতে শুরু করেছে। তাদের মতে, জামায়াত যদি কখনো রাষ্ট্রক্ষমতায় আসে, তবে দেশের নারী সমাজের কর্মজীবন ও চলাচলের স্বাধীনতা মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনার মধ্য দিয়ে জামায়াতে ইসলামী আবারও প্রমাণ করেছে—তারা যতই আধুনিক রাজনৈতিক দলের মুখোশ পরুক, নারীর প্রশ্নে তাদের মানসিকতা এখনো মধ্যযুগীয়। বিশ্লেষকরা আরও উল্লেখ করেন, জামায়াত আমিরের নির্বাচনী ইতিহাসও তার সীমিত জনসমর্থনের প্রতিফলন।
এই দেশ ভাষার জন্য রক্ত দিয়েছে, গণতন্ত্রের জন্য লড়েছে এবং নারীর সম্মানের প্রশ্নে বারবার রাজপথে নেমেছে। পর্যবেক্ষকদের মতে, জামায়াতে ইসলামী চাইলে এখনো ক্ষমা চাইতে পারে। না চাইলে ইতিহাস আবারও তাদের নাম লিখবে—গৌরবের পাতায় নয়, বরাবরের মতোই লজ্জার তালিকায়।
এদিকে মব জাস্টিসের আশঙ্কায় নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক কর্মজীবী নারী ইন্দু বাংলা টাইমসকে জানিয়েছেন, জামায়াতে ইসলামীর আমিরের বিরুদ্ধে চলতি সপ্তাহেই কঠোর কর্মসূচি নিয়ে রাজপথে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছেন তারা।
