মেঘ মালা চন্দ্র: বাংলাদেশ যখন স্বাধীনতার ৫৪ বছর উদযাপন করছে, ঠিক তখনই ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন আমাদের এক অদ্ভুত ‘টাইম ট্রাভেলের’ স্বাদ দিচ্ছে। চট্টগ্রামের অলিগলি থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় এখন উৎসবের চেয়ে আতঙ্কের আমেজই বেশি। বিশেষ করে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষজন হঠাৎ করেই এক বিশাল ‘রাজনৈতিক ভালোবাসার’ কবলে পড়েছেন। জামায়াতে ইসলামীর মতো একটি দল যখন সংখ্যালঘু ভোটারদের পরম মমতায় নিজেদের প্রার্থীকে ভোট দিতে উদ্বুদ্ধ করে, তখন সেই দৃশ্য দেখে বিড়ালের নিরামিষ ভোজের গল্পের কথা মনে পড়ে যায়। ১২ ফেব্রুয়ারির দৃশ্যটি ছিল আরও করুণ; ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ভোটাররা দেখলেন, তাদের হয়ে ভাবার জন্য একদল ‘দরদী’ কর্মী আগে থেকেই লাঠি-সোঁটা নিয়ে প্রস্তুত হয়ে আছেন। তারা কেবল ভোট চাচ্ছেন না, যেন ভোটারদের আত্মাকেই জামায়াতের চরণে সপে দেওয়ার নির্দেশ দিচ্ছেন।
এই ডিজিটাল যুগে আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মতৎপরতা দেখে আইটি বিশেষজ্ঞরা পর্যন্ত ঈর্ষা করতে পারেন। নারী-পুরুষ কর্মীরা মিলে হিন্দু ভোটারদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে এনআইডি কার্ডের ফটোকপি আর বিকাশ নম্বর সংগ্রহ করছেন। যারা ফটোকপি দিতে নারাজ, তাদের এনআইডি নম্বর সযতনে ডায়েরিতে টুকে রাখা হচ্ছে। সাধারণ মানুষের ধারণা ছিল, এনআইডি বুঝি ভোট দেওয়ার জন্য, কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে এটি মূলত ‘কে কার পক্ষে’ তা আগাম নিশ্চিত করার এক অব্যর্থ হাতিয়ার। এই যে সুপরিকল্পিতভাবে তথ্য সংগ্রহ, একে ‘ভয় প্রদর্শন’ বলাটা হয়তো ভুল হবে; এটা আসলে ভোটারদের জন্য একপ্রকার ‘আগাম বুকিং সিস্টেম’, যাতে নির্বাচনের দিন তাদের কষ্ট করে নিজের বিবেক খরচ করতে না হয়।
এই প্রতিযোগিতায় বিএনপির কিছু প্রার্থীও আবার পিছিয়ে নেই। সংখ্যালঘু ভোটারদের প্রতি তাদের এই ‘অস্বাভাবিক তৎপরতা’ দেখে মনে হচ্ছে, ভোটের মৌসুমে তারা যেন হঠাৎ করেই বড় ভাইয়ের মতো অতিরিক্ত স্নেহপ্রবণ হয়ে উঠেছেন। এই ভালোবাসার আতিশয্যে প্রান্তিক মানুষগুলো এখন নিজ ঘরেই সিঁধিয়ে আছেন। এদিকে আমাদের নির্বাচন কমিশন যেন এক হিমালয়সম ধৈর্য নিয়ে বসে আছে। বাইরে আর্তনাদ আর হুমকি-ধমকি চললেও তাদের কানে যেন মন্ত্রপুত তূলা গোঁজা। কমিশন হয়তো ভাবছে, ভোটাররা যদি হুমকির মুখেও ভোটকেন্দ্রে যায়, তবে তো গণতন্ত্রের পালকই ভারী হলো! ইউরোপীয় ইউনিয়নের পর্যবেক্ষকদের কাছে হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের নেতাদের অসহায়ত্বের বয়ান শুনে মনে হয়, আমরা আসলে একবিংশ শতাব্দীতে নেই, বরং মধ্যযুগের সেই ‘জোর যার মুল্লুক তার’ নীতিতেই থিতু হয়েছি।
রাজপথে যখন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের নেত্রীরা আর্তনাদ করে বলছেন যে নারীরা এই দেশের পূর্ণ নাগরিক, তখন একদল ‘নব্য সংস্কারক’ তাদের আবার অন্তঃপুরে ফেরত পাঠানোর স্বপ্ন দেখছেন। “আমরা নারী—আমাদের মেনে নিতে হবে”—এমন চমৎকার আধ্যাত্মিক বুলি দিয়ে নারীদের সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা করার যে মহোৎসব চলছে, তা আধুনিক ইতিহাসে বিরল। অর্থনীতির চাকা সচল রাখা নারীদের ঘরে ফেরানোর এই অদ্ভুত বাসনা যেন এক বিরাট কৌতুক। সব মিলিয়ে, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এই যে সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন আর নারীদের প্রতি অবমাননা, তা আমাদের গণতন্ত্রের কফিনে শেষ পেরেক ঠোকার এক সুনিপুণ মহড়া ছাড়া আর কিছুই নয়। রাজনীতিতে ধর্মের এই চতুর ব্যবহার আর সাধারণ মানুষের এনআইডি নিয়ে ছিনিমিনি খেলার এই নাটকটি শেষ পর্যন্ত কোন ট্র্যাজেডিতে গিয়ে থামে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
