মেঘ মালা চন্দ্র :
ঢাকা–১৭ আসনের জামায়াত মনোনীত প্রার্থী ডক্টর খালিকুজ্জামানকে ঘিরে ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় সাম্প্রতিক একটি ঘটনা রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র আলোচনার জন্ম দিয়েছে। স্পর্শকাতর এই নিরাপত্তা এলাকায় প্রবেশের সময় তার আচরণ এবং বক্তব্যকে ঘিরে সেনাবাহিনীর পেশাদারিত্ব, রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলা ও রাজনৈতিক দায়িত্ববোধের প্রশ্ন নতুন করে সামনে এসেছে।
ঘটনার বিবরণ অনুযায়ী, সশস্ত্র দেহরক্ষীসহ ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় প্রবেশ করতে গেলে কর্তব্যরত সেনাসদস্যরা প্রচলিত নিরাপত্তা প্রটোকল অনুসারে তাকে বাধা দেন। তবে এই পরিস্থিতিতে নিজেকে একজন নির্বাচনী প্রার্থী হিসেবে পরিচয় দেওয়ার পরিবর্তে ডক্টর খালিকুজ্জামান রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করেন বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন।
তিনি নিজেকে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের ‘নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বী’ হিসেবে উল্লেখ করে কর্তব্যরত সেনাসদস্যদের ওপর মৌখিক চাপ সৃষ্টি করার চেষ্টা করেন, যা উপস্থিত অনেকের কাছেই অপ্রত্যাশিত ও বিব্রতকর বলে বিবেচিত হয়েছে।
ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ভিডিওতে দেখা যায়, প্রার্থীর উস্কানিমূলক ও ঔদ্ধত্যপূর্ণ বক্তব্যের মুখেও সেনাসদস্যরা শান্ত, সংযত ও পেশাদার আচরণ বজায় রাখেন। এক পর্যায়ে ডক্টর খালিকুজ্জামান বলেন, “৫ই আগস্টের পর বড় বড় সেনা কর্মকর্তারা তাদের বাসায় গিয়ে পা ধরে বসে থাকতো”—এমন বক্তব্যকে অনেকেই সেনাবাহিনীর মর্যাদা ও ইতিহাসের প্রতি অবমাননাকর বলে অভিহিত করেছেন। তবুও দায়িত্বে থাকা জওয়ানরা কোনো প্রতিক্রিয়ায় না গিয়ে নিয়ম অনুযায়ী কর্তব্য পালন অব্যাহত রাখেন।
বিশ্লেষকদের মতে, সেনাসদস্যদের সম্পর্কে ‘পা চাটা’ জাতীয় শব্দচয়ন কেবল ব্যক্তিগত অসৌজন্য নয়; বরং এটি একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অবমাননার শামিল। এই প্রেক্ষাপটে সেনাবাহিনীর সংযত ও দৃঢ় অবস্থান আবারও প্রমাণ করেছে যে ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক উত্তেজনার ঊর্ধ্বে উঠে তারা রাষ্ট্রীয় দায়িত্বকেই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়।
ঘটনার পর সাবেক সেনাসদস্যদের সংগঠন এক্স-ফোর্সেস এসোসিয়েশন (EFA) তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। সংগঠনটির প্রেসিডেন্ট লেফটেন্যান্ট সাইফুল্লাহ খান সাইফ (অব:) এক বিবৃতিতে জানান, ডক্টর খালিকুজ্জামানের বক্তব্য সেনাবাহিনীর সম্মান ও জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে গুরুতর উদ্বেগের কারণ। তিনি ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রকাশ্যে ও নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে সতর্ক করে দেওয়া হয়, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ক্ষমা না চাইলে তাকে ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় Persona Non Grata (PNG) বা অবাঞ্ছিত ঘোষণা করার দাবি তোলা হবে। এ বিষয়ে কোনো রাজনৈতিক আপস করা হবে না বলেও সংগঠনটি স্পষ্ট করেছে।
এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়াও তীব্র। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন—যারা দেশের নিরাপত্তা রক্ষাকারীদের সম্মান করতে জানেন না, তারা আদৌ জনগণের প্রতিনিধি হওয়ার নৈতিক অধিকার রাখেন কি না। তাদের মতে, ক্যান্টনমেন্ট কোনো রাজনৈতিক প্রদর্শনীর স্থান নয়; এটি রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলার প্রতীক। এই মৌলিক বিষয়টি উপেক্ষা করাই একজন প্রার্থীর দায়িত্বজ্ঞানহীনতার প্রমাণ।
সব মিলিয়ে ঘটনাটি নির্বাচনকেন্দ্রিক রাজনীতিতে আচরণ, ভাষা ও দায়িত্ববোধ নিয়ে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। একই সঙ্গে এটি সেনাবাহিনীর পেশাদারিত্ব ও সংযমের একটি স্পষ্ট উদাহরণ হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে—যেখানে উস্কানির জবাব দেওয়া হয়নি, বরং শৃঙ্খলাই শেষ কথা হয়েছে।
(ঢাকা ১৭ নির্বাচনী আসনে জামাতের দলীয় প্রার্থী ডঃ খালেকুজ্জামানের সাথে সেনা সদস্যদের বাক-বিতান্ডার ভিডিও চিত্র সংবাদের সঙ্গে সংযুক্ত করা হল।)
