নিজস্ব প্রতিবেদক:
বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন অনুষ্ঠিত গণভোটে জনগণকে ‘না’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান গোলাম মোহাম্মদ কাদের (জি এম কাদের)।
তিনি বলেছেন, বিভ্রান্তিকর চারটি বিবৃতির আড়ালে সংবিধানের অন্তত ৩৮টি পরিবর্তন লুকিয়ে রাখা হয়েছে, যা দেশকে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও সংঘাতের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যায় নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক আইডি থেকে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে এসব কথা বলেন জি এম কাদের।
ভাষণে তিনি বলেন, সংবিধান সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আমাদের কোনো দ্বিমত নেই। তবে তা হতে হবে সংবিধানসম্মত, স্বচ্ছ ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নির্বাচিত সংসদ, সরকার ও জনগণের সম্মিলিত উদ্যোগে। কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর পূর্বনির্ধারিত এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য অস্বচ্ছ ও বেআইনি পথে যে সংস্কার প্রস্তাব আনা হয়েছে, তা আমাদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।
তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, এ ধরনের উদ্যোগ দেশে সংঘাতময় পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ব্যাহত হবে এবং দেশ ধ্বংসের পথে এগিয়ে যেতে পারে। সে কারণেই তিনি গণভোটে জনগণকে ‘না’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান।
জুলাই আন্দোলনের প্রসঙ্গ টেনে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান বলেন, তিনি ব্যক্তিগতভাবে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত জুলাই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং দলগতভাবেও জাতীয় পার্টি সক্রিয় ভূমিকা রেখেছে। তিনি জানান, শুধু রংপুর শহরেই জাতীয় পার্টির দুই কর্মী- মিরাজুল ও মানিক শহীদ হয়েছেন। এ ছাড়া চারজন কর্মী কারাবরণ ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন এবং শতাধিক নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে।
জি এম কাদের বলেন, জুলাই আন্দোলনে মৃত্যু বরণকারী সকল পরিবার ও নির্যাতিত নেতা-কর্মীদের যথাযথ মূল্যায়ন এবং তাদের স্বপ্ন বাস্তবায়নে জাতীয় পার্টি অঙ্গীকারাবদ্ধ।
দেশের সার্বিক পরিস্থিতি তুলে ধরে তিনি বলেন, বর্তমানে রাষ্ট্র ও সমাজ ভয়াবহ বিভাজনের মুখে পড়েছে। বিদ্বেষ ও অসহিষ্ণুতা ১৮ কোটি মানুষকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। সংখ্যালঘুদের বাড়িঘর, দোকান ও উপাসনালয়ে হামলা, দিনদুপুরে হত্যাকাণ্ড, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সহিংসতার ঘোষণা- সবকিছু মিলিয়ে এটি একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রের পূর্বলক্ষণ।
অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে শত শত কলকারখানা বন্ধ হয়ে গেছে, বাড়ছে বেকারত্ব। ব্যাংক রিজার্ভের প্রকৃত অবস্থা জনগণের অজানা। সীমান্ত নিরাপত্তা, নারীর নিরাপত্তা, শিল্প-সংস্কৃতি ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতাও আজ হুমকির মুখে।
জাতির উদ্দেশে ভাষণে জি এম কাদের বলেন, আমরা এমন বাংলাদেশ চাই যেখানে একজন নারী তার পোশাকের জন্য হেনস্তার শিকার হবে না, শিক্ষক ছাত্রের হাতে লাঞ্ছিত হবেন না, বাউল-শিল্পী বা ভিন্নমতের মানুষের কণ্ঠরোধ করা হবে না এবং প্রত্যেক নাগরিক সমান মর্যাদা ও অধিকার ভোগ করবে।
নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এই নির্বাচনে দুটি স্পষ্ট পক্ষ রয়েছে, একটি মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও ১৯৭১-এর পক্ষের শক্তি, অন্যটি সেই আদর্শবিরোধী অপশক্তি। জাতীয় পার্টিকে লাঙ্গল প্রতীকে ভোট দেওয়া মানে গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ ফিরিয়ে আনা এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে জয়যুক্ত করা।
ভাষণের শেষাংশে বিভাজনের রাজনীতি পরিহার করে জাতীয় ঐক্যের আহ্বান জানিয়ে জি এম কাদের বলেন, হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, নারী, পুরুষ, তৃতীয় লিঙ্গ কিংবা পাহাড়ি-সমতল- আমাদের সবার পরিচয় আমরা বাংলাদেশি। দেশ একটাই, দেশের প্রশ্নে আমরা সবাই এক।
গণতন্ত্র রক্ষা, অরাজকতা ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি বন্ধে জনগণকে লাঙ্গল প্রতীকে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, বিভাজন নয়, ঐক্য চাই, স্বৈরাচারমুক্ত গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ চাই।
