রেজাউল করিম রেজা,সিনিয়র সাংবাদিক: মানবাধিকার— শব্দটি উচ্চারণে যতটা মানবিক, বাস্তবে তার চর্চা আজ ততটাই প্রশ্নবিদ্ধ। সংবিধান, আন্তর্জাতিক সনদ এবং রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকারে মানবাধিকার বাংলাদেশের জন্য নতুন কোনো ধারণা নয়। তবু বর্তমান বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে প্রশ্ন উঠছে— এই অধিকার কি কেবল নীতিগত ঘোষণা, নাকি মানুষের জীবনে তার বাস্তব প্রতিফলন আছে?
বাংলাদেশে আজ মানুষ ও মানবাধিকারের সম্পর্ক ক্রমেই মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়াচ্ছে। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা কিংবা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার যুক্তি সামনে এনে নাগরিক অধিকারকে প্রায়ই গৌণ করে দেখা হচ্ছে। অথচ রাষ্ট্রের মূল ভিত্তিই হলো মানুষ, আর মানুষের মর্যাদা রক্ষাই মানবাধিকারের প্রধান উদ্দেশ্য।
মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বর্তমান সময়ের সবচেয়ে আলোচিত ও সংবেদনশীল বিষয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি মন্তব্য, একটি পোস্ট কিংবা সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত কোনো প্রতিবেদন— অনেক ক্ষেত্রেই নাগরিককে আইনি ঝুঁকির মুখে ফেলছে। ডিজিটাল ও সাইবার আইনের প্রয়োগ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে প্রশ্ন উঠলেও বাস্তবে সংশয় কাটেনি— এই আইন কি অপরাধ দমনের জন্য, নাকি ভিন্ন কণ্ঠকে নিয়ন্ত্রণের উপায়?
গণমাধ্যম ও মানবাধিকার একে অপরের পরিপূরক। কিন্তু বাস্তবে সাংবাদিকরা আজ নানামুখী চাপ, ভয় ও অনিশ্চয়তার মধ্যে কাজ করছেন। তথ্য সংগ্রহে বাধা, মাঠে হয়রানি, মামলা-মোকদ্দমা ও পেশাগত নিরাপত্তাহীনতা— এসব বিষয় স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিবেশকে সংকুচিত করছে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে এটি নিঃসন্দেহে একটি উদ্বেগজনক প্রবণতা।
আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। গ্রেপ্তার, রিমান্ড, হেফাজতে মৃত্যু কিংবা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কমছে না। প্রতিটি ঘটনার স্বচ্ছ তদন্ত ও কার্যকর জবাবদিহি না থাকায় মানুষের ন্যায়বিচারের আশা দুর্বল হয়ে পড়ছে। বিচার বিলম্বিত হলে কিংবা বিচার না হলে, আস্থার সংকট তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক।
সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো— মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলো ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে যাওয়া। কিছুদিন আলোচনা, কিছু বিবৃতি, তারপর নীরবতা। সমাজ যখন এসব ঘটনায় অভ্যস্ত হয়ে পড়ে, তখন মানবাধিকার আর মানুষের মৌলিক দাবি থাকে না, তা কেবল আন্তর্জাতিক দিবস বা প্রতিবেদনকেন্দ্রিক আলোচনায় সীমাবদ্ধ হয়ে যায়।
রাষ্ট্রের শক্তি কেবল কঠোর আইন বা বলপ্রয়োগে নয়। প্রকৃত শক্তি আসে ন্যায়বিচার, স্বচ্ছতা ও মানবিক শাসন থেকে। মানবাধিকারকে রাষ্ট্রের জন্য হুমকি হিসেবে দেখার মানসিকতা শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রকেই দুর্বল করে দেয়। কারণ অধিকারবঞ্চিত মানুষ কখনোই দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার ভিত্তি হতে পারে না।
বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় সবচেয়ে জরুরি হলো মানবাধিকারকে রাজনৈতিক চাপ বা আন্তর্জাতিক ইমেজের বিষয় হিসেবে না দেখে নাগরিক জীবনের মৌলিক ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করা। আইন প্রয়োগে স্বচ্ছতা, স্বাধীন তদন্ত, বিচার বিভাগের কার্যকর ভূমিকা এবং ভিন্নমতের প্রতি সহনশীলতা, এসবই মানবাধিকার সুরক্ষার অপরিহার্য শর্ত।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা খুব সরল, কিন্তু গভীর—
মানুষ কি মানবাধিকারের জন্য,নাকি মানবাধিকারই মানুষের জন্য?
এই প্রশ্নের উত্তরের মধ্যেই নিহিত রয়েছে বাংলাদেশের গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও মানবিক রাষ্ট্র হয়ে ওঠার ভবিষ্যৎ।
