মেঘ মালা চন্দ্র: এটা কোনো সভা ছিল না।
এটা কোনো মিছিলও না।
এটা ছিল একটি রাষ্ট্রের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকা একজন মায়ের নীরব যুদ্ধ।
সামনের পিচঢালা রাস্তাটা সেদিন আর সাধারণ রাস্তা ছিল না—ওটা হয়ে উঠেছিল ক্ষমতার কাঠগড়ায় দাঁড় করানো এক টুকরো ইতিহাস। কোনো মাইক ছিল না, কোনো স্লোগানের ঢেউ ছিল না। ছিল শুধু একজন নারী, তার কোলজুড়ে দুইটি দুধের শিশু, আর বুকভরা এমন এক সাহস—যা বন্দুকও ভয় পায়।
জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে, শহরের শোরগোলের মাঝখানে, তিনি দাঁড়িয়েছিলেন একা। হাতে কোনো প্ল্যাকার্ড নেই, কোনো দলের ছাপ নেই। তাই নিজের পরনের ওড়নাকেই তিনি বানিয়েছিলেন প্রতিবাদের ভাষা। লাল কালি দিয়ে সেই ওড়নায় লেখা হয়েছিল সত্য—যে সত্য শাসক শুনতে চায় না, যে সত্য বললেই রাষ্ট্র কেঁপে ওঠে।
ওড়নাটা ছিল নরম কাপড়ের।
কিন্তু তাতে লেখা শব্দগুলো ছিল আগুনের।
আর আগুন দেখলেই স্বৈরশাসকের হাত কাঁপে।
হঠাৎ করেই সেখানে হাজির হয় একদল যুবক—ক্ষমতার দালাল, ভয় রপ্ত করা মুখ। অশ্লীল গালাগালি, হুমকি, ধাক্কা—সব মিলিয়ে তারা দেখিয়ে দেয়, এই দেশে যুক্তির ভাষা নয়, বলপ্রয়োগই নিয়ম। একজন মায়ের শরীর থেকে ওড়না টেনে নেওয়া হয়। ছিনিয়ে নেওয়া হয় তার কণ্ঠ। মাটিতে ফেলে পা দিয়ে মাড়িয়ে দেওয়া হয় লেখা—যেন শব্দ পিষে ফেললেই সত্য মরে যাবে।
চারপাশে মানুষ ছিল।
তারা দেখেছে।
তারা নীরব ছিল।
কারণ এই রাষ্ট্র মানুষকে প্রথমেই নীরব হতে শেখায়।
কিন্তু প্রশ্নটা তখন আর চাপা থাকে না—
একজন নারীকে, তার দুই নিষ্পাপ শিশুকে, এত ভয় কেন?
একটি ওড়নায় লেখা কয়েকটি শব্দ কি এতটাই ভয়ংকর?
‘জয় বাংলা’ বলা একজন মানুষ কি রাষ্ট্রের জন্য এত বড় হুমকি যে তাকে দমাতে পুলিশ নামাতে হয়?
অবশেষে পুলিশ আসে।
কিন্তু আশ্চর্য—
যারা গালাগালি করল, যারা ওড়না ছিনিয়ে নিল, যারা পা দিয়ে মাড়িয়ে দিল প্রতিবাদের ভাষা—তাদের কেউ অপরাধী নয়।
অপরাধী হলো সেই মা।
কোলের শিশুরা তখনো জানে না—কেন আজ তাদের এই বন্দিত্ব।
তারা জানে না ‘রাষ্ট্র’, ‘নির্বাচন’ কিংবা ‘অবৈধতা’ কী।
তবু তারাও আজ আসামি।
তার অপরাধ কী?
তিনি মাথা নত করেননি।
তিনি চুপ থাকেননি।
তিনি পাতানো নির্বাচনের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন।
আজ প্রশ্ন শুধু একজন নারীর গ্রেপ্তার নয়।
আজ প্রশ্ন রাষ্ট্রের চরিত্র।
কোথায় রাখা হয়েছে সেই মা ও তার শিশুদের?
কোন থানার অন্ধকার ঘরে আজ বন্দী আছে বাংলার সাহসের প্রতিচ্ছবি?
এই ঘটনাটা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়—প্রতিবাদের জন্য জনসমুদ্র লাগে না। লাগে শুধু একজন মানুষ, যে ভয়কে জয় করতে জানে। আর সেই মানুষ যদি একজন মা হন, তবে তার ওড়নাই হয়ে ওঠে সবচেয়ে শক্তিশালী ব্যানার।
আজ হয়তো তাকে তালাবদ্ধ করা হয়েছে।
কিন্তু তার ওড়নায় লেখা শব্দগুলো আজ মানুষের বুকের ভেতর ছড়িয়ে পড়েছে আগুন হয়ে।
এই আগুন কোনো লাঠিচার্জে নিভবে না।
কোনো গ্রেপ্তারে থামবে না।
কারণ ইতিহাস বলে—
যে রাষ্ট্র একজন মায়ের কণ্ঠরোধ করতে ভয় পায়,
সে রাষ্ট্র আসলে নিজের পতনের দলিল নিজেই লিখে ফেলে।
