মেঘমালা চন্দ্র : একুশে মানেই স্মৃতির অর্গল খুলে যাওয়ার মাহেন্দ্রক্ষণ। কিন্তু ২০২৬ সালের এই ফেব্রুয়ারি আমাদের সামনে এক বীভৎস বৈপরীত্য নিয়ে হাজির হয়েছে। একদিকে রাজপথে অমর একুশের চেতনার গুঞ্জন, অন্যদিকে জাতীয় নির্বাচনের নামে ‘মব জাস্টিস’ ও সহিংসতার এক আদিম উল্লাস। রাজপথে চলছে কথিত ‘হ্যাঁ-না’ ভোটের প্রহসনমূলক প্রচারণা, আর তার আড়ালে বয়ে যাচ্ছে রক্তের চোরাস্রোত। ময়মনসিংহের শেরপুরে নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণাকে কেন্দ্র করে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যকার সাম্প্রতিক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ এবং জামায়াত নেতার মৃত্যু আজ চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে—যাদের মৈত্রীর ভিত্তি কেবল ক্ষমতার লোভ, আদর্শ নয়; তাদের পরিণতি এর চেয়ে সম্মানজনক হতে পারে না।
অধ্যাপক আবদুল গফুর: সত্যের শেষ কণ্ঠস্বর
আজকের এই রাজনৈতিক অরাজকতার সময়ে কানে বাজে সেই প্রবীণ ভাষাসৈনিকের কণ্ঠস্বর, যিনি আর আমাদের মাঝে নেই। অধ্যাপক আবদুল গফুর—গত ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৪-এ ৯৬ বছর বয়সে চিরবিদায় নিয়েছেন। তবে সৌভাগ্যবশত তার সেই ঐতিহাসিক শেষ সাক্ষাৎকারটি নেওয়ার সুযোগ হয়েছিল আমার, যা একটি নিউজ পোর্টালে প্রকাশিত হয়। বয়সের ভারে ন্যুব্জ সেই মানুষটি স্পষ্ট উচ্চারণে মনে করিয়ে দিয়েছিলেন, এই বাংলাদেশ কোনো দয়া বা খয়রাতি রাষ্ট্র নয়; এটি জন্ম নিয়েছে রক্তে, প্রতিবাদে আর মাথা নত না করার অদম্য সংকল্পে। ১৯৪৭ সালে আজিমপুরের ১৯ নম্বর বাসায় প্রিন্সিপাল আবুল কাসেমের হাত ধরে যে ‘তমদ্দুন মজলিস’ গঠিত হয়েছিল, অধ্যাপক গফুর ছিলেন তার জীবন্ত ইতিহাস। তিনি স্বচক্ষে দেখেছিলেন, ক্ষমতার বলয়ের বাইরে থেকেও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কীভাবে রাজপথের অকুতোভয় নেতা হিসেবে ভাষা আন্দোলনের নকশা তৈরি করেছিলেন।
আদর্শের নিলাম বনাম ২০০ টাকার বেইমানি
বায়ান্নর সেই উত্তাল দিনগুলোতে ভাষা আন্দোলন কেবল আবেগ ছিল না, তা ছিল বাঙালির অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। অথচ সেই অগ্নিপরীক্ষার ক্ষণে জাতি দেখেছে গোলাম আযমদের মতো একদল মীরজাফরের সুবিধাবাদী চরিত্র। অধ্যাপক গফুরের জবানিতে উঠে আসা সেই নির্মম সত্যটি আজ তরুণ প্রজন্মের জানা প্রয়োজন—গোলাম আযম ছিলেন চরম দোদুল্যমান এক সত্তা। আদর্শ নয়, যেখানে সুবিধা ছিল, সেখানেই তিনি নতি স্বীকার করতেন। আজ যারা রাজনীতির মাঠে ধর্মের বুলি আওড়ান, তাদের নেতা তখন মাতৃভাষার মর্যাদাকে তুচ্ছ জ্ঞান করে মাত্র ২০০ টাকার মাসোহারার বিনিময়ে ‘তমদ্দুন মজলিস’ ত্যাগ করে জামায়াতে যোগ দিয়েছিলেন। অর্থাৎ, একটি জাতির আত্মপরিচয়ের চেয়েও তাদের কাছে বড় ছিল মাসিক বেতনের খাম।
এই পৈশাচিক সুবিধাবাদ সেখানেই থেমে থাকেনি। স্বাধীনতার পর করাচিতে বসে গোলাম আযম অত্যন্ত দম্ভের সাথে বলেছিলেন—ভাষা আন্দোলনে যোগ দেওয়া নাকি তার জীবনের বড় ‘ভুল’ ছিল। যে রক্তস্নাত বর্ণমালাকে তিনি ‘ভুল’ বলে ঘৃণা ভরে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন, আজ কোন লজ্জায় তাদের উত্তরসূরিরা এই বাংলার পবিত্র মাটিতে রাজনীতির আস্ফালন দেখায়? এটি আমাদের জাতীয় ইতিহাসের ওপর এক নির্লজ্জ কষাঘাত ছাড়া আর কিছু নয়।
বিএনপি: স্বাধীনতাবিরোধীদের চিরস্থায়ী ‘অক্সিজেন’
বাংলাদেশের রাজনীতির সবচেয়ে বড় কলঙ্কজনক অধ্যায় হলো, এই গণধিকৃত ও ইতিহাস-বিবর্জিত শক্তিকে রাজনৈতিক ‘অক্সিজেন’ দিয়ে বাঁচিয়ে রেখেছে বিএনপি। ক্ষমতার লালসায় অন্ধ হয়ে তারা ভুলে গেছে এই মাটি শহীদের রক্তে ভেজা। জামায়াত ও বিএনপির এই সম্পর্ক আসলে ‘সাপ-বেজীর সম্পর্ক’—পরস্পরের প্রতি তীব্র ঘৃণা থাকা সত্ত্বেও কেবল ক্ষমতার ভাগাভাগির জন্য তারা একে অপরকে জড়িয়ে ধরে আছে।
শেরপুরের সাম্প্রতিক সহিংসতা প্রমাণ করে, এই সখ্যতা কেবলই এক মরিচিকা। বিএনপির মতো একটি দল যখন জামায়াতের মতো চরমপন্থী ও ভাষা-বিরোধী শক্তির কাঁধে সওয়ার হয়, তখন তারা প্রকারান্তরে বায়ান্ন এবং একাত্তরের খুনিদেরই পুনর্বাসিত করে। এই অস্বস্তিকর সহাবস্থান আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, যখন আদর্শের চেয়ে ভোটের সমীকরণ বড় হয়ে ওঠে, তখন দেশ ও ইতিহাস দুই-ই ক্ষতবিক্ষত হয়। মব জাস্টিসের নামে যে নৈরাজ্য আজ চালানো হচ্ছে, তা এই সুবিধাবাদী রাজনীতিরই বিষফল।
নেতৃত্বের ধ্রুবতারা বনাম ইতিহাসের আস্তাকুঁড়
ইতিহাস অত্যন্ত নির্মম; এটি কাউকে তোষামোদ করে না, কাউকে ক্ষমাও করে না। যখন ভাষা আন্দোলনের সূচনালগ্ন চলছিল, তখন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন সংগ্রামের তপ্ত কেন্দ্রবিন্দু। জেল, জুলুম কিংবা ফাঁসিকাষ্ঠের ভয়—কোনো কিছুই তাকে আদর্শচ্যুত করতে পারেনি। পাকিস্তান ভাঙার গুঞ্জন নিয়ে অধ্যাপক গফুরের প্রশ্নের জবাবে তিনি অবিচল চিত্তে বলেছিলেন—”নতুন প্রজন্ম ও দেশের জনগণ চাইলে তাই হবে।” বঙ্গবন্ধু জানতেন, ভাষার অধিকারই হবে বাঙালির রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির মূল সোপান। যেখানে জামায়াত টাকার অঙ্কে নিজেদের ইমান বিক্রি করছিল, সেখানে বঙ্গবন্ধু নিজের জীবন বাজি রেখে ভবিষ্যতের স্বাধীন মানচিত্রের রূপরেখা আঁকছিলেন।
ইতিহাসের বিচার শুরু হয়েছে
আজ ২০২৬ সালের এই উত্তপ্ত ফ্রেব্রুয়ারিতে, যখন মব জাস্টিস আর নির্বাচনের নামে পেশিশক্তির মহড়া চলছে, তখন আমাদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এসেছে। আমরা কি সেই অকুতোভয় ইতিহাসের উত্তরাধিকারী হব, নাকি সুবিধাবাদের পিচ্ছিল পথে পা বাড়াব?
যারা বাঙালির আবেগ নিয়ে ছিনিমিনি খেলেছে, যারা একাত্তরের নরঘাতকদের উত্তরসূরি এবং বায়ান্নর আন্দোলনের পিঠে ছুরি মেরেছে, তাদের রাজনীতির আস্তাকুঁড়ে ছুড়ে ফেলার এখনই শ্রেষ্ঠ সময়। দোদুল্যমানতা কোনো জাতিকে মুক্তি দেয় না। ইতিহাস কেবল তাদেরই স্বর্ণাক্ষরে ধরে রাখে, যারা সত্যের পাশে পাহাড়ের মতো অটল থাকে—যেমন ছিলেন বঙ্গবন্ধু এবং অধ্যাপক আবদুল গফুররা। আর যারা সময় বুঝে গিরগিটির মতো রঙ বদলায় এবং টাকার লোভে আদর্শ বিকিয়ে দেয়, ইতিহাসের মূল পাতায় তাদের কোনো স্থান নেই। তাদের নাম ছিল এবং থাকবে ফুটনোটের ঘৃণিত অন্ধকার গলিতে
