নিজস্ব প্রতিবেদক: আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য গণভোট ও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নির্বাচন কমিশন (ইসি) প্রকাশিত তথ্যানুযায়ী, এবার ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন মোট ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৮৯৫ জন ভোটার। তবে অতীত নির্বাচনের পরিসংখ্যান, আওয়ামী লীগের নির্বাচনী মাঠে অনুপস্থিতি, বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে-এই বিপুল সংখ্যক ভোটারের প্রায় ৭০ শতাংশই ভোটকেন্দ্রে না যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এবারের নির্বাচনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো দেশের প্রধান রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণ না করা। ফলে প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন এই নির্বাচনে সাধারণ ভোটারদের মধ্যে আগ্রহ ও উদ্দীপনা দৃশ্যমান নয়।
অতীতের ভোটের হিসাব:
২০০১ সালের ১ অক্টোবর অনুষ্ঠিত অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বড় দলগুলোর ভোটের আনুপাতিক হার ছিল— বিএনপি ৪০.৯০ শতাংশ, আওয়ামী লীগ ৪০.১০ শতাংশ, জাতীয় পার্টি ৯ শতাংশ এবং জামায়াতে ইসলামী ৫.৫০ শতাংশ।
অন্যদিকে, ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পায় ৪৬ শতাংশ, বিএনপি ৩২ শতাংশ, জাতীয় পার্টি ১০ শতাংশ এবং জামায়াতে ইসলামী ৪ শতাংশ ভোট।
এই দুই নির্বাচনের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট ও সমমনা ইসলামিক দলগুলো সম্মিলিতভাবে প্রায় ৪৭ শতাংশ ভোট পেয়েছিল। সেটিকে ভিত্তি ধরে বর্তমান বাস্তবতায় জামায়াতে ইসলামী ও অন্যান্য ইসলামিক দলের সম্মিলিত ভোটব্যাংক প্রায় ১৫ শতাংশের কাছাকাছি থাকলেও কার্যত তারা সর্বোচ্চ ১০ থেকে ১১ শতাংশ ভোট রেকর্ড করতে পারবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
অন্যদিকে বিএনপির একক ভোটব্যাংক বর্তমানে আনুমানিক ৩০ শতাংশের আশপাশে থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে দলটির বিভিন্ন নেতাকর্মীর নেতিবাচক কর্মকাণ্ড এবং মূল প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগ নির্বাচনে না থাকায় বিএনপির একটি বড় অংশের ভোটারও ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার তাগিদ অনুভব করছেন না।
এ হিসেবে বিএনপির প্রায় ১০ শতাংশ ভোটার অনাগ্রহী হয়ে পড়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। ফলে অবশিষ্ট ভোটারের মধ্যে সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ ভোটার কেন্দ্রে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সব মিলিয়ে নির্বাচন যদি পুরোপুরি সুষ্ঠু ও প্রভাবমুক্ত হয়, তাহলে মোট ভোটার উপস্থিতি ৩০ থেকে ৩১ শতাংশের বেশি নাও হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও বড় চ্যালেঞ্জ:
নির্বাচন ঘিরে দেশের বিভিন্ন স্থানে সহিংসতা, সংঘর্ষ ও রাজনৈতিক উত্তেজনার খবর পাওয়া যাচ্ছে। চট্টগ্রাম, খুলনা, শেরপুর, নোয়াখালী’সহ কয়েকটি জেলায় সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের ঘটনা সাধারণ ভোটারদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করেছে।
রাজধানী ঢাকার ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অনেকেই মনে করছেন ভোট দিতে গিয়ে ঝুঁকিতে পড়ার চেয়ে ঘরে থাকাই নিরাপদ। তাঁদের ভাষ্য- দেশের প্রধান দলই যখন নেই, তখন ভোট দিয়ে কী হবে? তার ওপর আবার মারামারি-সংঘর্ষ। পরিবার নিয়ে চিন্তায় আছেন তারা।
দেশের বিভিন্ন জেলার সাধারণ ভোটাররাও বলছেন- আগে ভোট মানেই উত্তেজনা ছিল, এবার তো প্রতিদ্বন্দ্বিতাই নেই। তাই আগ্রহও নেই। এমন ভোট ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করছেন অনেকে।
আওয়ামী লীগের অবস্থান:
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা বারবার বলে আসছেন, এই নির্বাচন জনগণের প্রতিনিধিত্বমূলক নয়। দলটির এক কেন্দ্রীয় নেতা বলেন, এই নির্বাচন একতরফা ও জনগণবিচ্ছিন্ন। জনগণ ও দেশের সর্ববৃহৎ রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণ ছাড়া কোনো নির্বাচনই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
আওয়ামী লীগের আরেক শীর্ষ নেতা দাবি করেন, সরকার ও নির্বাচন কমিশন নিরপেক্ষ পরিবেশ নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে। প্রধান বিরোধী শক্তিকে বাইরে রেখে আয়োজিত নির্বাচনে প্রকৃত জনমত প্রতিফলিত হওয়ার সুযোগ নেই।
দলীয় সভানেত্রী সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়ও এই একতরফা নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করেছেন। শনিবার তিনি তাঁর ভেরিফায়েড ফেসবুক আইডিতে ‘নৌকা ছাড়া-কিসের ভোট, নো নৌকা-নো ভোট’ লেখা একটি ফটোকার্ড পোস্ট করেন। মুহূর্তেই সেটি ভাইরাল হয়ে যায়। একই বার্তা সম্বলিত ফটোকার্ড আওয়ামী লীগের হাজার হাজার নেতাকর্মী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করেন। এর প্রভাব সাধারণ ভোটারদের ওপরও পড়েছে।
ভোটার উপস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ:
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কা এবং সাধারণ ভোটারদের অনাগ্রহ- এই তিনটি বিষয় মিলেই এবারের নির্বাচনে ঐতিহাসিকভাবে কম ভোটার উপস্থিতির সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
এদিকে, একই দিনে গণভোট ও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হওয়ায় ভোটারদের মধ্যে বাড়তি বিভ্রান্তি দেখা দিয়েছে। সরকার, বিএনপি এবং ১১ দলীয় জোটের পক্ষ থেকে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার প্রচারণা চললেও গণভোট কী- তা জানেন না দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।
সবকিছু মিলিয়ে ১২ ফেব্রুয়ারির গণভোট ও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় কতটা ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে- তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। বাস্তবতা হলো, ভোটারদের বড় একটি অংশ যদি কেন্দ্রমুখী না হয়, তাহলে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি হতে পারে।
