অতিথি প্রতিবেদক- আব্দুল কাদের মির্জা: গত ৩০ জানুয়ারি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম টুইটারে জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান তার ভ্যারিফায়েড আইডি থেকে নারীদের ঘর থেকে প্রয়োজনে বের হওয়াকে ‘পতিতাবৃত্তির স্বরূপ’ বলে যে মন্তব্য করেছেন, তা শুধু নারীদের প্রতি অবমাননাই নয়-এটি আমাদের সমাজ, অর্থনীতি ও ধর্মীয় মূল্যবোধের ওপর সরাসরি আঘাত।
আজ বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮০ শতাংশ আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। এই খাতে কর্মরত শ্রমিকদের প্রায় ৬০–৬৫ শতাংশই নারী। গ্রাম থেকে শহরে এসে লাখো নারী কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে নিজেদের পরিবারকে স্বাবলম্বী করেছেন। পাশাপাশি শিক্ষক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মী হিসেবে নারীরা মানবসম্পদ উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছেন। সেই কর্মজীবী ও শিক্ষার্থী নারীদের উদ্দেশে এমন কুরুচিপূর্ণ বক্তব্য কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
আমি শফিকুর রহমানের কাছে সরাসরি প্রশ্ন রাখতে চাই-আপনার ঘরের যেসব নারী প্রয়োজনে বাইরে বের হন, তাদের প্রতিও কি আপনার দৃষ্টিভঙ্গি একই? জামায়াত ও তাদের ছাত্রী সংস্থার যেসব নারী কর্মী নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নিচ্ছেন, তাদের ক্ষেত্রেও কি আপনি একই মন্তব্য করবেন?
দুঃখজনক হলেও সত্য, নারী বিদ্বেষের এই রাজনীতি জামায়াতের জন্য নতুন নয়। ইতিহাসের দিকে তাকালেই দেখা যায়-১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে নারী নির্যাতনের ভয়াবহ অধ্যায় থেকে শুরু করে পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন ওয়াজ-মাহফিল ও রাজনৈতিক কর্মসূচিতে নারীদের নিয়ে কুরুচিপূর্ণ বক্তব্য-সবই একটি ধারাবাহিকতার অংশ। ধর্মের অপব্যাখ্যা দিয়ে নারীদের তুচ্ছতাচ্ছিল্য করার এই প্রবণতা বারবার সামনে এসেছে।
অথচ ইসলাম নারীদের সর্বোচ্চ সম্মান দিয়েছে। আল্লাহর ঘরে নারী-পুরুষ সমান অধিকার নিয়ে তাওয়াফ করেন। মদিনায় নারীরা মসজিদে নামাজ আদায় করেন। আমাদের প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) তাঁর স্ত্রী বিবি খাদিজা (রা.)-এর ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে সহযোগিতা করেছেন। ইসলাম কখনোই নারীদের ঘরে বন্দি করে রাখার কথা বলেনি, কিংবা তাদের অবমাননা করার অনুমতি দেয়নি।
আজ যারা ধর্মের দোহাই দিয়ে কর্মজীবী ও শিক্ষার্থী নারীদের নিয়ে কটূক্তি করছে, তারা আসলে ধর্ম নয়,নিজেদের রাজনৈতিক এজেন্ডাকেই সামনে আনছে। তাদের দৃষ্টিতে নারী যেন কেবল ভোগ্যপণ্য। এই মানসিকতা আমাদের সমাজকে মধ্যযুগীয় অন্ধকারে ঠেলে দেওয়ার শামিল।
ইতোমধ্যে অনেক সাহসী নারী এই বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়েছেন—আমি তাদের প্রতি সম্মান ও সংহতি জানাই। নারী সমাজের প্রতি এমন কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য কোনোভাবেই বরদাস্ত করা যায় না।
আমি সচেতন নাগরিক সমাজের প্রতি আহ্বান জানাই-নিজ নিজ অবস্থান থেকে এই নারী বিদ্বেষী রাজনীতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান। যারা পরিকল্পিতভাবে বাংলাদেশকে পাকিস্তান বা আফগানিস্তানের পথে নিতে চায়, তাদের এই ঘৃণ্য চক্রান্ত প্রতিহত করুন। গণতন্ত্র, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও নারী সম্মান রক্ষায় ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তুলুন।
নারী অবমাননার রাজনীতি নয়-আমাদের প্রয়োজন সমতা, সম্মান ও উন্নয়নের বাংলাদেশ।
